মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্সিং গাইড
নার্সিংয়ে মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্সিং: আপনার সুস্থতার পথে একজন নিবেদিতপ্রাণ বন্ধু
কেমন আছেন আমার প্রিয় পাঠক বন্ধুরা? আশা করি সবাই সুস্থ আছেন, ভালো আছেন। আমি মোছাঃ সুমনা খাতুন, আপনাদেরই একজন নার্স। নিজের কাজটা আমি ভীষণ ভালোবাসি। মানুষের সেবা করার যে শান্তি, সেটা সত্যিই অন্যরকম। আর এই ভালোবাসা থেকেই আমার এই ব্লগে আপনাদের সাথে আমার অভিজ্ঞতাগুলো ভাগ করে নেওয়া।
আজ আমরা কথা বলবো নার্সিংয়ের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ শাখা নিয়ে — সেটা হলো মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্সিং বা Med-Surg Nursing। আসলে, যখনই আমরা কোনো হাসপাতালে ঢুকি, সবচেয়ে বেশি যেই নার্সদের সাথে আমাদের দেখা হয়, তারাই হলেন এই মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্সরা। সত্যি বলতে কি, নার্সিংয়ের এই ক্ষেত্রটি এত বিস্তৃত আর এত জরুরি যে, এটার গুরুত্ব বলে বোঝানো যায় না।
আমি নিজে দেখেছি, কীভাবে একজন রোগী সুস্থ হয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরে যান, আর এর পেছনে আমাদের মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্সদের অবদান কতটা বড়। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এই পেশায় থাকতে হলে শুধু বইয়ের জ্ঞান থাকলেই হয় না, সাথে থাকতে হয় মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর সেবা করার এক অদম্য ইচ্ছা। তাহলে চলুন, কথা না বাড়িয়ে শুরু করা যাক, মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্সিং আসলে কী এবং কেন এটি এতোটা গুরুত্বপূর্ণ!
মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্সিং (Medical Surgical Nursing) আসলে কী?
সহজ কথায় বলতে গেলে, মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্সিং হলো নার্সিংয়ের এমন একটি বিশেষ ক্ষেত্র যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের সাধারণ থেকে জটিল সব রোগের যত্ন নেওয়া হয়। এর মধ্যে যেমন কোনো সার্জারির (Surgery) আগে ও পরের যত্ন (Pre and Post Operative Care) থাকে, তেমনি বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা (Chronic Illnesses) এবং হঠাৎ হওয়া রোগের (Acute Illnesses) চিকিৎসাও অন্তর্ভুক্ত।
আপনি যখন কোনো সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি হন, তখন আপনাকে যে নার্সরা সেবা দেন, তারাই সাধারণত মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্স। বাংলাদেশে হোক বা পৃথিবীর অন্য কোথাও, এই নার্সরাই হাসপাতালের মেরুদণ্ড। কারণ, অধিকাংশ রোগীই এই ওয়ার্ডগুলোতে ভর্তি থাকেন। তারা শুধু ডাক্তারদের নির্দেশ অনুযায়ী ওষুধ দেন না, বরং রোগীর সার্বিক সুস্থতার জন্য নিরলস কাজ করে যান। তাদের কাজের পরিধি সত্যিই অনেক বড় এবং বহুমুখী।
কেন মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্সিং এতোটা গুরুত্বপূর্ণ? (Why Medical Surgical Nursing is so Important?)
দেখুন, নার্সিংয়ের আরও অনেক শাখা আছে, যেমন পেডিয়াট্রিক নার্সিং (Pediatric Nursing), ক্রিটিক্যাল কেয়ার নার্সিং (Critical Care Nursing) ইত্যাদি। কিন্তু মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্সিংয়ের গুরুত্বটা একটু ভিন্ন কারণে। আমি নিজে দেখেছি, আমাদের দেশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা কতটা বেশি! আর এই বিশাল সংখ্যক রোগীদের সিংহভাগই কিন্তু মেডিকেল বা সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে ভর্তি হন।
আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, একজন মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্সকে (Medical Surgical Nurse) অনেক ধরনের রোগীর সাথে কাজ করতে হয়। যেমন ধরুন, কারও হার্টের সমস্যা, কারও ডায়াবেটিস, কারও কিডনির রোগ, আবার কারও হয়তো কোনো অপারেশন হয়েছে। এত বিচিত্র সব রোগীর যত্ন নেওয়ার জন্য তাদের জ্ঞান আর দক্ষতা দুটোই ব্যাপক হতে হয়। একটি কথা বলে রাখি, এই নার্সরা হচ্ছেন রোগীর সাথে সবথেকে বেশি সময় কাটানো স্বাস্থ্যকর্মী। তারাই রোগীর ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে ধরতে পারেন। এই কারণে, তাদের পর্যবেক্ষণ (Observation) এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা (Quick Decision Making) একজন রোগীর জীবন বাঁচাতে পারে।
আপনি কি জানেন, একজন মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্স শুধুমাত্র শারীরিকভাবে রোগীর সেবা দেন না, তারা মানসিক এবং সামাজিকভাবেও রোগীদের সাপোর্ট দেন? বাংলাদেশে যেখানে রোগীর সাথে পরিবারের সদস্যরাও ওয়ার্ডে থাকেন, সেখানে নার্সদের জন্য রোগীর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সাথেও যোগাযোগ রক্ষা করা, তাদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, বা তাদের মানসিক শক্তি যোগানোটা একটা বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। এই সামগ্রিক যত্নই মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্সিংকে করে তোলে এতটা গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্স (Medical Surgical Nurse) হিসেবে আমাদের প্রধান দায়িত্বগুলো কী কী?
তাহলে চলুন, এবার জেনে নেওয়া যাক একজন মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্স হিসেবে আমাদের ঠিক কী কী দায়িত্ব পালন করতে হয়। সত্যি বলতে, এই কাজগুলো খুবই জরুরি এবং প্রত্যেকটির জন্যই দরকার বিশেষ দক্ষতা।
১. রোগীর সার্বিক মূল্যায়ন (Patient Assessment)
এটি আমাদের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যখন একজন রোগী ভর্তি হন বা ডিউটিতে আমরা নতুন কোনো রোগীর দায়িত্ব নিই, প্রথমেই আমরা রোগীর সার্বিক অবস্থা মূল্যায়ন করি। আমি নিজে দেখেছি, অনেক সময় রোগীর সামান্য শারীরিক পরিবর্তনও বড় কোনো সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
- ভাইটাল সাইনস (Vital Signs) পর্যবেক্ষণ: রক্তচাপ (Blood Pressure), নাড়ির স্পন্দন (Pulse Rate), শ্বাস-প্রশ্বাস (Respiratory Rate) এবং শরীরের তাপমাত্রা (Temperature) নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়।
- শারীরিক পরীক্ষা (Physical Examination): রোগীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করা হয়। যেমন, তার ত্বকের রঙ কেমন, শ্বাস-প্রশ্বাসে কোনো অস্বাভাবিক শব্দ আছে কিনা, পেটে ব্যথা আছে কিনা ইত্যাদি।
- ব্যথার মাত্রা পরিমাপ (Pain Assessment): রোগীর ব্যথার মাত্রা জিজ্ঞাসা করা হয় এবং ব্যথার ধরন বোঝা হয়। এর জন্য স্কেল ব্যবহার করা হয়, যেমন ০-১০ এর মধ্যে ব্যথা কত?
- শারীরিক ক্রিয়াকলাপের মূল্যায়ন (Functional Assessment): রোগী নিজে খেতে পারছেন কিনা, টয়লেটে যেতে পারছেন কিনা, হাঁটতে পারছেন কিনা—এসব দেখা হয়।
এই মূল্যায়নগুলো নিয়মিত করলে আমরা বুঝতে পারি রোগীর অবস্থার উন্নতি হচ্ছে নাকি অবনতি হচ্ছে। এতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়।
২. সঠিক ওষুধ ব্যবস্থাপনা (Medication Management)
রোগীকে সঠিক সময়ে, সঠিক মাত্রায়, সঠিক ওষুধ দেওয়াটা একজন নার্সের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। একটি ভুল ওষুধ রোগীর জীবন বিপন্ন করতে পারে। এই জন্য ওষুধ প্রশাসন (Medication Administration) এর ক্ষেত্রে আমরা অত্যন্ত সতর্ক থাকি।
- "5 R's" নিয়ম অনুসরণ:
- সঠিক রোগী (Right Patient)
- সঠিক ওষুধ (Right Drug)
- সঠিক মাত্রা (Right Dose)
- সঠিক পথ (Right Route)
- সঠিক সময় (Right Time)
- ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ: ওষুধ দেওয়ার পর রোগীর শরীরে কোনো অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে কিনা, তা খেয়াল রাখা।
- রোগীকে শিক্ষাদান: রোগী এবং তার পরিবারকে ওষুধ সম্পর্কে জানানো, যেমন—কেন এই ওষুধ দেওয়া হচ্ছে, এর সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী হতে পারে ইত্যাদি। বাংলাদেশে অনেক সময় দেখা যায়, নিরক্ষর বা স্বল্পশিক্ষিত পরিবারকে এটা বোঝানো একটা চ্যালেঞ্জের কাজ। কিন্তু অবশ্যই এটা ধৈর্য ধরে করতে হয়।
আমরা জানি যে, অনেক রোগী এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা ওষুধের নাম বা কাজ ঠিকমতো বোঝেন না। এই পরিস্থিতিতে আমাদেরকেই দায়িত্ব নিয়ে তাদের বুঝিয়ে দিতে হয়, যাতে তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেও ঠিকঠাক ওষুধ চালিয়ে যেতে পারেন।
৩. ক্ষত পরিচর্যা ও সংক্রমণ প্রতিরোধ (Wound Care and Infection Prevention)
সার্জারির পর বা আঘাতের কারণে অনেক রোগীর শরীরে ক্ষত বা ঘা হয়। এই ক্ষতগুলো সঠিকভাবে যত্ন না নিলে সংক্রমণ (Infection) হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠাকে বিলম্বিত করে। আমি দেখেছি, একটি ছোট ক্ষতও যদি ঠিকমতো পরিষ্কার না করা হয়, সেটা বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
- ক্ষত পরিষ্কার করা (Wound Cleaning): জীবাণুমুক্ত পদ্ধতিতে (Sterile Technique) ক্ষত পরিষ্কার করা।
- ড্রেসিং পরিবর্তন (Dressing Change): নিয়মিতভাবে ক্ষত ড্রেসিং পরিবর্তন করা এবং ক্ষতের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা। ঘা ড্রেসিং (Wound Dressing) এর গুরুত্ব অপরিসীম।
- সংক্রমণের লক্ষণ পর্যবেক্ষণ: ক্ষত লালচে হচ্ছে কিনা, ফুলে যাচ্ছে কিনা, পুঁজ (Pus) বের হচ্ছে কিনা, বা রোগীর জ্বর আসছে কিনা—এগুলো খেয়াল রাখা।
- সংক্রমণ প্রতিরোধ: হাত ধোয়া (Hand Hygiene), গ্লাভস পরা এবং জীবাণুমুক্ত সরঞ্জাম ব্যবহার করে ক্রস-ইনফেকশন (Cross-infection) প্রতিরোধ করা।
একটি কথা বলে রাখি, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে রোগীদের অনেকেরই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে তেমন ধারণা থাকে না। তাই, তাদের এবং তাদের পরিবারকে ক্ষতের যত্ন এবং পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব সম্পর্কে জানানোটা আমাদের একটা বাড়তি দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।
৪. শ্বাস-প্রশ্বাস ও অক্সিজেন থেরাপি (Respiratory & Oxygen Therapy)
অনেক রোগীর শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বিশেষ করে ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত বা সার্জারির পর। এমন অবস্থায় নার্সদের ভূমিকা খুবই জরুরি।
- শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ: রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসের হার, গভীরতা, কোনো অস্বাভাবিক শব্দ বা শ্বাসকষ্টের লক্ষণ আছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা।
- অক্সিজেন থেরাপি (Oxygen Therapy): চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী রোগীকে অক্সিজেন সরবরাহ করা এবং অক্সিজেনের মাত্রা (Oxygen Saturation) নিয়মিত মনিটর করা।
- নেবুলাইজেশন (Nebulization): শ্বাসকষ্ট কমাতে বা ফুসফুসে ওষুধ পৌঁছে দিতে নেবুলাইজার ব্যবহার করা।
- সাকশনিং (Suctioning): রোগীর শ্বাসতন্ত্রে জমা কফ বা শ্লেষ্মা বের করে আনা, যাতে তার শ্বাস নিতে সুবিধা হয়।
এই কাজগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং রোগীর অবস্থা দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে বলে নার্সদেরকে সবসময় সতর্ক থাকতে হয়।
৫. তরল ও ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য বজায় রাখা (Fluid and Electrolyte Balance)
রোগীর শরীরে তরল ও লবণের (Electrolytes) ভারসাম্য বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা বমি বা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত, বা যাদের কিডনির সমস্যা আছে, তাদের ক্ষেত্রে এটি জরুরি।
- ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড (Intravenous Fluid) ব্যবস্থাপনা: চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী শিরায় তরল (IV Fluid) দেওয়া এবং সঠিক গতিতে দেওয়া হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করা।
- ইনপুট/আউটপুট চার্ট (Input/Output Chart): রোগী কতটা তরল গ্রহণ করছেন (খাওয়া, IV Fluid) এবং কতটা তরল শরীর থেকে বের হচ্ছে (মূত্র, বমি, ডায়রিয়া) তার হিসাব রাখা। এটি বাংলাদেশে অনেক সময় চ্যালেঞ্জিং হয় কারণ রোগীরা নিজেরাই অনেক কিছু খেয়ে ফেলেন যা রেকর্ডে আসে না।
- ডিহাইড্রেশন (Dehydration) এর লক্ষণ পর্যবেক্ষণ: রোগীর ত্বক শুষ্ক হচ্ছে কিনা, প্রস্রাব কমে যাচ্ছে কিনা, জিহ্বা শুকিয়ে যাচ্ছে কিনা — এসব খেয়াল রাখা।
এই ভারসাম্য ঠিক না থাকলে রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে পারে, এমনকি জীবনও বিপন্ন হতে পারে।
৬. অপারেশন পরবর্তী যত্ন (Post-operative Care)
সার্জারির পর রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠায় নার্সদের ভূমিকা অপরিসীম। অপারেশন পরবর্তী যত্ন (Post-operative Care) অত্যন্ত জরুরি একটি দিক।
- ভাইটাল সাইনস পর্যবেক্ষণ: অপারেশনের পর রোগীর রক্তচাপ, হার্ট রেট, শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা।
- ব্যথা ব্যবস্থাপনা (Pain Management): অপারেশনের পর ব্যথা একটি বড় সমস্যা। রোগীর ব্যথার মাত্রা মূল্যায়ন করে ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়া এবং আরামদায়ক অবস্থা নিশ্চিত করা।
- রক্তক্ষরণ পর্যবেক্ষণ: সার্জিক্যাল সাইটে (Surgical Site) কোনো রক্তক্ষরণ হচ্ছে কিনা তা খেয়াল রাখা।
- বমি বমি ভাব ও বমি নিয়ন্ত্রণ: অপারেশনের পর অনেক রোগীর বমি বমি ভাব বা বমি হতে পারে, সেগুলোর জন্য ওষুধ দেওয়া।
- প্রথম চলাফেরা (Early Ambulation): চিকিৎসকের অনুমতি নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে বিছানা থেকে উঠে অল্প হাঁটাহাঁটি করতে উৎসাহিত করা, যা রক্ত জমাট বাঁধা (DVT) প্রতিরোধে সাহায্য করে। আপনি কি জানেন, বাংলাদেশে অনেক রোগী ব্যথা বা দুর্বলতার কারণে হাঁটতে চান না, তখন আমাদের তাদের বোঝাতে হয় এর গুরুত্ব।
- মূত্রনালী ও মলত্যাগের পর্যবেক্ষণ: রোগী স্বাভাবিকভাবে প্রস্রাব-পায়খানা করতে পারছেন কিনা তা খেয়াল রাখা।
এই যত্নগুলো নিশ্চিত করে একজন রোগীকে দ্রুত সুস্থ করে তোলায় আমরা সরাসরি ভূমিকা পালন করি।
৭. ব্যথা ব্যবস্থাপনা (Pain Management)
ব্যথা মানুষের জন্য খুবই কষ্টদায়ক একটি অভিজ্ঞতা। একজন নার্স হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো রোগীর ব্যথা কমিয়ে তাকে আরাম দেওয়া।
- ব্যথা মূল্যায়ন: রোগীর ব্যথা কেমন, কোথায় ব্যথা, কতক্ষণ ধরে ব্যথা—এগুলো জিজ্ঞাসা করা।
- ওষুধ প্রয়োগ: চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যথানাশক ওষুধ (Pain Killers) সঠিক সময়ে প্রয়োগ করা।
- অ-ওষুধী পদ্ধতি (Non-pharmacological methods): অনেক সময় মালিশ করা, উষ্ণ বা ঠান্ডা সেঁক দেওয়া, রোগীকে আরামদায়ক অবস্থানে রাখা, বা মনোযোগ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া—এসবও ব্যথা কমাতে সাহায্য করে।
- রোগীকে শান্ত করা: অনেক সময় শুধু রোগীর সাথে কথা বলেও তাকে মানসিকভাবে শান্ত করা যায়, যা তার ব্যথার অনুভূতি কমিয়ে দেয়।
ব্যথা একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি, তাই প্রত্যেকের ব্যথা অনুভব করার ধরনও ভিন্ন। একজন নার্সকে রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হয় এবং তার প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হয়।
৮. রোগী ও পরিবারকে শিক্ষা দান (Patient and Family Education)
রোগীকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার আগে এবং চিকিৎসার পুরোটা সময় জুড়ে তাদের এবং তাদের পরিবারকে রোগ ও চিকিৎসা সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেওয়াটা খুব জরুরি। রোগী ও পরিবারের শিক্ষা (Patient and Family Education) দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।
- রোগ সম্পর্কে তথ্য: রোগটি কী, কেন হয়েছে, কীভাবে এর চিকিৎসা করা হচ্ছে—এসব জানানো।
- ওষুধের ব্যবহার: বাড়ি গিয়ে কোন ওষুধ কতবার খেতে হবে, কীভাবে খেতে হবে, কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা, সে সম্পর্কে বিস্তারিত বলা।
- খাদ্য ও জীবনযাত্রা: কোন খাবার খেতে হবে, কোনটা এড়িয়ে চলতে হবে, জীবনযাত্রায় কী পরিবর্তন আনতে হবে তা জানানো।
- পুনরায় ফলোআপ (Follow-up) এর গুরুত্ব: পরবর্তী চেকআপের জন্য কবে আসতে হবে এবং কেন আসা জরুরি তা বোঝানো।
- ঘরের যত্ন: যদি কোনো ক্ষত থাকে বা বিশেষ কোনো যত্নের প্রয়োজন হয়, তবে কীভাবে ঘরে বসে সেই যত্ন নেওয়া যাবে, তা হাতে কলমে দেখিয়ে দেওয়া। সত্যি বলতে কি, আমাদের দেশের অনেক রোগী গ্রামে থাকেন, যাদের জন্য এই হোম কেয়ারের (Home Care) পরামর্শগুলো খুবই কাজে দেয়।
এই শিক্ষাগুলো রোগীকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং তাকে সুস্থ জীবন যাপন করতে সাহায্য করে।
৯. জরুরি অবস্থার মোকাবিলা (Emergency Management)
হাসপাতালে যেকোনো সময় জরুরি অবস্থা তৈরি হতে পারে। একজন মেডিকেল সার্জিক্যাল নার্সকে (Medical Surgical Nurse) এসব পরিস্থিতি সামলানোর জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।
- দ্রুত মূল্যায়ন: রোগীর হঠাৎ অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত মূল্যায়ন করে সমস্যার কারণ বোঝার চেষ্টা করা।
- প্রাথমিক চিকিৎসা: যেমন, যদি রোগীর শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়, তখন দ্রুত সিপিআর (CPR) শুরু করা।
- চিকিৎসককে জানানো: তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসককে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা এবং তার নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
- সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা: জরুরি অবস্থায় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম দ্রুত হাতের কাছে পাওয়া যায় তা নিশ্চিত করা।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে নার্সদের শান্ত থাকা এবং দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটা খুব জরুরি।
আজকে পর্যন্তই কথা হবে পরবর্তীতে অন্য কোন টপিক নিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত ভালো থাকুন।