পেডিয়াট্রিক নার্সিং টিপস

পেডিয়াট্রিক নার্সিং টিপস: শিশুদের সুস্থ রাখার সহজ উপায়!

কেমন আছেন আমার প্রিয় পাঠক বন্ধুরা? আশা করি সবাই ভালো আছেন। আমি মোছাঃ সুমনা খাতুন, আপনাদের পরিচিত এক সেবিকা। নিজের কাজ আর অভিজ্ঞতা থেকে আপনাদের সাথে কথা বলতে আমার সত্যি বলতে খুব ভালো লাগে। আজ আমরা কথা বলবো পেডিয়াট্রিক নার্সিং নিয়ে। আমার এই দীর্ঘ সেবার জীবনে, শিশুদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার জীবনের এক অমূল্য সম্পদ। শিশুদের সেবা শুশ্রূষা করা, তাদের কষ্ট বুঝতে পারা আর সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করাটা আসলে কোনো সাধারণ কাজ নয়, এটা এক শিল্প, এক বিশাল দায়িত্ব।

Pediatric Nursing Tips

আমি নিজে দেখেছি, শিশুদের শারীরিক অবস্থা আর বড়দের শারীরিক অবস্থা কিন্তু একদম আলাদা। তাদের অনুভূতি, তাদের ভয়, তাদের কথা বলার ধরণ — সবকিছুই বড়দের থেকে ভিন্ন। তাই শিশুদের যত্ন নেওয়ার জন্য চাই বিশেষ দক্ষতা আর মমতা। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, একজন ভালো পেডিয়াট্রিক নার্স হতে হলে শুধুমাত্র বইয়ের জ্ঞান থাকলেই চলে না, চাই হৃদয় ভরা ভালোবাসা আর ধৈর্য।

আজ আমি আপনাদের সাথে আমার অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া কিছু বিশেষ পেডিয়াট্রিক নার্সিং টিপস শেয়ার করব। এই টিপসগুলো নতুন নার্স আপুদের জন্য যেমন কাজে দেবে, তেমনি বাবা-মা বা অভিভাবকদের জন্যও হয়তো বেশ সহায়ক হবে। তাহলে চলুন কথা না বাড়িয়ে শুরু করা যাক আমাদের আজকের আলোচনা।

শিশুদের সেবা: কেন এটা বড়দের থেকে আলাদা?

দেখুন, একজন শিশুকে যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখন শুধু সে একা আসে না, তার সাথে আসে এক বুক ভয়, একরাশ অস্থিরতা। মা-বাবা বা অভিভাবকরাও থাকেন দুশ্চিন্তায়। একটি শিশু কিন্তু তার অসুস্থতার কথা বড়দের মতো গুছিয়ে বলতে পারে না। তার ব্যথা কোথায়, তার কেমন লাগছে – এসব বোঝানো অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। একটি কথা বলে রাখি, শিশুদের শরীরের গঠন, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ঔষধের প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়া – সবকিছুই বড়দের চেয়ে ভিন্ন। তাই পেডিয়াট্রিক নার্সিং এর ক্ষেত্রে অনেক বেশি সংবেদনশীল এবং সতর্ক থাকতে হয়। একটি ছোট্ট ভুল, অনেক বড় বিপদের কারণ হতে পারে।

১. শিশুদের সাথে যোগাযোগের গুরুত্ব: আপনার বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণই তাদের সেরা ঔষধ

শিশুদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করাটা পেডিয়াট্রিক নার্সিংয়ের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আমি দেখেছি, একটি হাসি, একটি নরম স্পর্শ, বা একটি খেলনা তাদের মনকে অনেক শান্ত করতে পারে। যখন কোনো শিশু প্রথম আমাদের কাছে আসে, তখন সে ভয় পায়, কাঁদে। এই সময় সরাসরি তার চিকিৎসা শুরু করলে সে আরও ভয় পেয়ে যাবে।

  • প্রথমেই বন্ধুত্ব করুন: চেষ্টা করুন প্রথমে তাদের সাথে গল্প করার। তাদের প্রিয় কার্টুন, খেলনা বা স্কুলের কথা জিজ্ঞেস করুন। আমি নিজে ছোট ছোট পুতুল বা ছবির বই সাথে রাখি। সেগুলো দেখিয়ে গল্প করলে বাচ্চারা সহজেই আমার সাথে মিশে যায়। এতে করে তাদের ভয় অনেকটাই কমে আসে। আপনিও পারবেন এই কাজটি খুব সহজে করতে।
  • সহজ ভাষায় কথা বলুন: শিশুদের সাথে কথা বলার সময় জটিল মেডিকেল শব্দ ব্যবহার করবেন না। সহজ, সাবলীল এবং তাদের বোঝার মতো ভাষায় কথা বলুন। যেমন, ঔষধ দেওয়ার সময় আপনি বলতে পারেন, "এই ম্যাজিক পানি খেলে তোমার পেটের ব্যথা চলে যাবে!"
  • সত্যি কথা বলুন, কিন্তু শান্তভাবে: যদি কোনো বেদনাদায়ক প্রক্রিয়া করতে হয়, যেমন ইনজেকশন দেওয়া, তখন তাদের সত্যি কথা বলুন। কিন্তু আশ্বস্ত করুন যে, ব্যথাটা অল্প সময়ের জন্য হবে এবং আপনি তাদের পাশেই থাকবেন। মিথ্যা বললে শিশুরা বিশ্বাস হারায় এবং পরবর্তীতে আপনার সাথে সহযোগিতা করতে চায় না।
  • বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগ: বাবা-মা বা অভিভাবকরা শিশুর মানসিক অবস্থার উপর অনেক প্রভাব ফেলেন। তাদের সাথে খোলামেলা কথা বলুন। শিশুর অসুস্থতা, চিকিৎসার ধরণ এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা দিন। তাদের উদ্বেগের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আশ্বস্ত করুন। অনেক সময় দেখেছি, বাবা-মায়ের অস্থিরতা দেখে শিশু আরও বেশি ভয় পায়। তাই তাদের শান্ত রাখাও আমাদের দায়িত্ব।

২. শিশুদের শারীরিক পরীক্ষা এবং গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ পর্যবেক্ষণ: ছোট শরীরে বড় নজর

শিশুদের শারীরিক পরীক্ষা করা বড়দের থেকে বেশ চ্যালেঞ্জিং। তারা এক জায়গায় শান্ত হয়ে বসে থাকে না। তাদের শরীরের তাপমাত্রা, পালস রেট, শ্বাস-প্রশ্বাস, রক্তচাপ – সবকিছু বয়সের সাথে পরিবর্তিত হয়।

  • সঠিক সরঞ্জাম ব্যবহার করুন: শিশুদের জন্য অবশ্যই সঠিক আকারের সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হবে। যেমন, শিশুদের জন্য ছোট কাফযুক্ত ব্লাড প্রেশার মেশিন, ছোট স্টেথোস্কোপ ব্যবহার করা উচিত। একটি কথা বলে রাখি, সঠিক সরঞ্জাম ব্যবহার না করলে ভুল ফলাফল আসতে পারে, যা চিকিৎসার জন্য বিপজ্জনক।
  • ধীরে ধীরে পরীক্ষা করুন: তাড়াহুড়ো না করে ধীরে ধীরে শিশুর শারীরিক পরীক্ষা করুন। তাদের শরীরের তাপমাত্রা, শ্বাস-প্রশ্বাস এবং হার্ট রেট দেখার সময় খেলার ছলে করুন। আমি দেখেছি, যখন শিশুরা ঘুমিয়ে থাকে, তখন তাদের পালস এবং শ্বাস-প্রশ্বাস মাপা সহজ হয়।
  • ব্যথা পর্যবেক্ষণ: শিশুরা তাদের ব্যথা প্রকাশ করতে পারে না। তাই নার্স হিসেবে আমাদের খুবই সতর্ক থাকতে হয়। ছোট শিশুদের ব্যথার লক্ষণগুলো হলো – অতিরিক্ত কান্না, মুখভঙ্গী পরিবর্তন, শরীরের কোনো অংশ ধরে রাখা, অস্থিরতা বা চুপচাপ হয়ে যাওয়া। ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন স্কেল বা অন্যান্য ব্যথা পরিমাপক স্কেল ব্যবহার করে ব্যথার মাত্রা অনুমান করতে হয়। অবশ্যই ব্যথার সঠিক মূল্যায়ন খুবই জরুরি।
  • ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা: বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া একটি খুব সাধারণ রোগ, যা থেকে দ্রুত ডিহাইড্রেশন হতে পারে। ডিহাইড্রেশনের লক্ষণগুলো ভালোভাবে জানতে হবে। যেমন, চোখ বসে যাওয়া, মুখ ও জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া, চামড়া কুঁচকে যাওয়া, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, অস্থিরতা বা নিস্তেজ হয়ে যাওয়া। এই লক্ষণগুলো দেখলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক।

৩. ঔষধ প্রয়োগের কৌশল: সঠিক মাত্রা, সঠিক পদ্ধতি, সঠিক সময়ে

শিশুদের ঔষধ দেওয়াটা অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি কাজ। ঔষধের মাত্রা নির্ধারণ, প্রয়োগের পদ্ধতি এবং শিশুর মানসিক অবস্থা – সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

আমি নিজে দেখেছি, ঔষধের ডোজ সামান্য এদিক-ওদিক হলেই শিশুদের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। কারণ তাদের শরীর বড়দের মতো ঔষধ সহ্য করতে পারে না।

  • সঠিক ডোজ গণনা: শিশুদের জন্য ঔষধের মাত্রা তাদের বয়স এবং ওজন অনুযায়ী গণনা করা হয়। একটি ছোট্ট ভুলও এখানে মারত্মক হতে পারে। তাই ডোজ গণনার সময় অবশ্যই অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রয়োজনে দ্বিতীয়বার যাচাই করে নিতে হবে।
  • প্রয়োগের পদ্ধতি: শিশুদের ঔষধ দেওয়ার অনেক পদ্ধতি আছে।
    1. মৌখিক (Oral): সিরাপ বা ড্রপার দিয়ে ঔষধ দেওয়ার সময় নিশ্চিত করুন যেন শিশু পুরোটা খেয়ে ফেলে। অনেক সময় শিশুরা ঔষধ থুতু দিয়ে ফেলে বা বমি করে দেয়। এক্ষেত্রে তাদের মন ভোলানোর চেষ্টা করুন। খেলনা দিয়ে বা মজার গল্প বলে তাদের মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়ে ঔষধ দিন। আমি দেখেছি, একটু মিষ্টি কিছু দিয়ে ঔষধ মিশিয়ে দিলে বাচ্চারা সহজে খেয়ে ফেলে, তবে সব ঔষধ এভাবে মেশানো যায় না, সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।
    2. ইনজেকশন (Injection): ইনজেকশন দেওয়ার সময় শিশুকে ভালোভাবে প্রস্তুত করা জরুরি। তাদের বলুন, "একটু ছোট্ট পিঁপড়া কামড় দেবে, তারপর তুমি সুস্থ হয়ে যাবে।" ইনজেকশন দেওয়ার পর জায়গাটা ভালোভাবে ধরে রাখুন এবং তাদের মনোযোগ অন্যদিকে সরানোর জন্য কিছু একটা দিন।
    3. রেকটাল (Rectal) বা সাপোজিটরি: জ্বর কমানোর জন্য বা অন্যান্য ক্ষেত্রে সাপোজিটরি ব্যবহার করা হয়। এটি প্রয়োগের পদ্ধতি এবং সঠিক স্থানে স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে।
    4. ইন্ট্রাভেনাস (Intravenous): আইভি ফ্লুইড বা ঔষধ দেওয়ার সময় শিরা খুঁজে বের করাটা অনেক সময় কঠিন হয়। এই সময় ধৈর্যের সাথে কাজ করতে হয়। ছোটদের শিরাগুলো খুব নাজুক হয়, তাই খুব সাবধানে ক্যানুলা প্রবেশ করাতে হয়। নিশ্চিত করতে হবে যেন ক্যানুলা ঠিকমতো বসেছে এবং কোনো ফোলা বা ব্যথা হচ্ছে না।
  • পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: ঔষধ দেওয়ার আগে এবং পরে অবশ্যই হাত স্যানিটাইজ করে নিতে হবে। ঔষধের বোতল বা ড্রপার সবসময় পরিষ্কার রাখতে হবে।

৪. সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ: শিশুদের রোগ প্রতিরোধের প্রথম ধাপ

শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বড়দের চেয়ে কম থাকে, তাই তারা খুব সহজেই বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত হতে পারে। হাসপাতাল পরিবেশে সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য কঠোর নিয়ম মানা আবশ্যক।

  • হাত ধোয়ার গুরুত্ব: আমি দেখেছি, হাসপাতালে সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর সংক্রমণ প্রতিরোধের উপায় হলো হাত ধোয়া। প্রতিটি রোগীর কাছে যাওয়ার আগে এবং আসার পর অবশ্যই ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। এটি শুধু রোগীর সুরক্ষা নয়, নিজের সুরক্ষার জন্যও আবশ্যক।
  • সরঞ্জাম জীবাণুমুক্তকরণ: থার্মোমিটার, স্টেথোস্কোপ, ব্লাড প্রেশার কাফ – এই ধরনের সরঞ্জাম প্রতিটি শিশুর ব্যবহারের পর জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
  • মাস্ক এবং গ্লাভসের ব্যবহার: যখন কোনো শিশুর ফ্লু বা অন্য কোনো সংক্রামক রোগ থাকে, তখন অবশ্যই মাস্ক এবং গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে। শুধুমাত্র শিশুর সুরক্ষার জন্য নয়, অন্য শিশু বা নিজের সুরক্ষার জন্যও এটি জরুরি।
  • আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা: যদি সম্ভব হয়, সংক্রামক রোগাক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে সংক্রমণ ছড়াতে না পারে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এটি সবসময় সম্ভব না হলেও, কাছাকাছি থাকা শিশুদের মধ্যে যেন সরাসরি কোনো সংস্পর্শ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা যায়।

৫. পুষ্টি ও হাইড্রেশন: সুস্থতার ভিত্তি

শিশুদের সুস্থ করে তোলার জন্য পুষ্টি এবং সঠিক পরিমাণে পানি বা তরল খাবার নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন তারা অসুস্থ থাকে, তখন তাদের খাওয়া-দাওয়ায় অনীহা দেখা যায়।

  • তরল খাবার নিশ্চিত করুন: ডায়রিয়া বা জ্বরে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত ডিহাইড্রেশন হতে পারে। তাই তাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল খাবার যেমন – ওরাল স্যালাইন, ডাবের পানি, ভাতের মাড়, সুপ ইত্যাদি দেওয়া জরুরি। ছোট ছোট চুমুকে ঘন ঘন পানি বা স্যালাইন দিতে হবে। আপনিও পারবেন এই কাজটি নিশ্চিত করতে।
  • পুষ্টিকর খাবার: অসুস্থ শিশুদের জন্য হালকা, সহজপাচ্য এবং পুষ্টিকর খাবার দেওয়া উচিত। যেমন, নরম ভাত, ডাল, মাছের ঝোল, ফলমূল ইত্যাদি। জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা না করে, অল্প অল্প করে বার বার দেওয়ার চেষ্টা করুন।
  • শিশুকে আগ্রহী করে তোলা: খাবারের প্রতি শিশুদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য খাবারকে আকর্ষণীয়ভাবে পরিবেশন করতে পারেন। যেমন, খাবারকে বিভিন্ন রঙে সাজিয়ে বা মজাদার গল্প বলে খাওয়ানোর চেষ্টা করুন।
  • স্তন্যপান: ছোট শিশুদের জন্য মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নেই। অসুস্থ অবস্থায়ও শিশুকে স্তন্যপান করানো চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করতে হবে, যদি চিকিৎসকের কোনো নিষেধ না থাকে। মায়ের দুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

৬. নিরাপত্তা এবং পরিবেশ: একটি নিরাপদ আশ্রয়

হাসপাতালে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একজন পেডিয়াট্রিক নার্সের প্রধান দায়িত্বের মধ্যে একটি। ছোট শিশুরা কৌতূহলী হয় এবং যেকোনো কিছু মুখে দিতে পারে বা বিছানা থেকে পড়ে যেতে পারে।

  • বিছানার পাশ উঁচু রাখুন: শিশুদের বিছানার দুই পাশ অবশ্যই উঁচু করে রাখতে হবে, যাতে তারা কোনোভাবে পড়ে না যায়। আমি দেখেছি, একটু অসাবধানতা অনেক বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
  • তীক্ষ্ণ বস্তু দূরে রাখুন: হাসপাতালের প্রতিটি কোণা থেকে ধারালো বস্তু, ছোট খেলনা বা ঔষধপত্র শিশুদের নাগালের বাইরে রাখতে হবে। অনেক সময় দেখেছি, শিশুরা ছোট ছোট জিনিস মুখে দিয়ে ফেলে।
  • পরিষ্কার এবং আরামদায়ক পরিবেশ: শিশুর জন্য একটি পরিষ্কার, শান্ত এবং আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। রুমের তাপমাত্রা যেন সহনশীল থাকে এবং অতিরিক্ত আলো বা শব্দ যেন না থাকে।
  • বাবা-মায়ের নির্দেশনা: বাবা-মা বা অভিভাবকদেরও শিশুর নিরাপত্তার বিষয়ে অবগত করতে হবে। তাদের বলতে হবে যেন তারা শিশুটিকে একা না রাখে এবং হাসপাতালের নিয়মাবলী মেনে চলে।

৭. বাবা-মা এবং পরিবারের জন্য মানসিক সমর্থন: শুধু শিশুর নয়, পরিবারেরও যতœ

একটি শিশু যখন অসুস্থ হয়, তখন পুরো পরিবারই দুশ্চিন্তায় ভোগে। একজন নার্স হিসেবে আমাদের দায়িত্ব শুধু শিশুর চিকিৎসা করা নয়, বরং তাদের পরিবারকেও মানসিক সমর্থন দেওয়া।

  • সহানুভূতি দেখান: বাবা-মায়ের উদ্বেগ, ভয় বা হতাশা মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং সহানুভূতি দেখান। তাদের বলুন যে আপনি তাদের পাশে আছেন এবং শিশুর সুস্থতার জন্য সবরকম চেষ্টা করছেন।
  • সঠিক তথ্য দিন: শিশুর অবস্থা সম্পর্কে তাদের নিয়মিতভাবে এবং স্পষ্ট ভাষায় তথ্য দিন। ভুল তথ্য বা অস্পষ্ট কথা তাদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দেয়।
  • আশা দিন, কিন্তু বাস্তবতা মেনে: তাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করুন, কিন্তু মিথ্যা আশ্বাস দেবেন না। কঠিন পরিস্থিতিতেও তাদের সাথে খোলামেলা কথা বলুন এবং পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে ধারণা দিন।
  • শিক্ষাগত সহায়তা: অনেক সময় বাবা-মায়েরা জানেন না কীভাবে অসুস্থ শিশুর যত্ন নিতে হয়। তাদের ঔষধ খাওয়ানোর পদ্ধতি, খাবারের নিয়মাবলী, বা অন্য যেকোনো পরিচর্যার বিষয়ে ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দিন। আমি দেখেছি, যখন বাবা-মায়েরা নিজেরা শিশুর যত্নে অংশ নিতে পারে, তখন তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং শিশুও দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। আপনিও পারবেন এই জ্ঞানটুকু শেয়ার করে তাদের পাশে দাঁড়াতে।

আসলে, একজন পেডিয়াট্রিক নার্সের কাজটা শুধু শরীরিক যত্ন নয়, এর সাথে মানসিক এবং আবেগিক দিকগুলোও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিটি শিশুর নিজস্ব এক জগৎ থাকে। তাদের কষ্ট, তাদের হাসি, তাদের ছোট ছোট আবদার – এই সব কিছুকেই সম্মান জানিয়ে আমাদের কাজ করতে হয়। আমি দেখেছি, যখন একটি শিশু সুস্থ হয়ে হাসিমুখে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরে, সেই দৃশ্য একজন নার্সের জন্য পৃথিবীর সেরা পুরস্কার। সত্যি বলতে, এই পেশায় না থাকলে আমি হয়তো এই আনন্দগুলো অনুভব করতে পারতাম না।

উপসংহার

প্রিয় বন্ধুরা, আশা করি আমার এই পেডিয়াট্রিক নার্সিং টিপসগুলো আপনাদের জন্য উপকারী হবে। শিশুদের সেবা করাটা এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এই পেশায় আসতে হলে যেমন কঠোর প্রশিক্ষণ দরকার, তেমনি দরকার অসীম ধৈর্য, মমতা আর ভালোবাসা। প্রতিটি শিশুকে নিজের সন্তানের মতো করে দেখলে দেখবেন, আপনার কাজটা অনেক সহজ হয়ে যাবে। আমি নিজে দেখেছি, যখন একজন নার্স মন থেকে শিশুদের যত্ন নেন, তখন তাদের সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াও অনেক দ্রুত হয়।

মনে রাখবেন, প্রতিটি শিশু এক একটি সম্ভাবনার দুয়ার। তাদের সুস্থ করে তোলা মানেই একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ তৈরি করে দেওয়া। একজন পেডিয়াট্রিক নার্স হিসেবে আমাদের দায়িত্ব অনেক বড়, কিন্তু এর প্রাপ্তিও অসীম। আপনিও যদি এই পথে আসেন, বা যদি আপনি একজন অভিভাবক হয়ে থাকেন, তাহলে অবশ্যই এই বিষয়গুলো মনে রাখবেন। ছোট ছোট যত্ন, বড় পরিবর্তন আনতে পারে। আমি সবসময় আপনাদের পাশে আছি, আপনাদের যেকোনো প্রশ্ন থাকলে বা কিছু জানতে চাইলে অবশ্যই কমেন্ট করে জানাবেন। আবার দেখা হবে নতুন কোনো বিষয় নিয়ে, ততদিন সবাই ভালো থাকবেন এবং শিশুদের সুস্থ রাখবেন। আল্লাহ হাফেজ!

No Comments
Add Comment
comment url
মোছাঃ সুমনা খাতুন
Author পরিচিতি:
👤 মোছাঃ সুমনা খাতুন
BNMC রেজিস্টার্ড নার্স
🏢 পদবী: Senior Staff Nurse
🏥 চাকরি: Nasir Uddin Memorial Hospital

Related Posts

Loading...