বেড মেকিং করে ইনফেকশন কমানোর উপায়

বেড মেকিং: ইনফেকশন কমানোর সহজ অথচ কার্যকরী উপায়, আমার অভিজ্ঞতা থেকে!

কেমন আছেন সবাই? আমি মোছাঃ সুমনা খাতুন, আপনাদের প্রিয় নার্স আপা। আশা করি সবাই ভালো আছেন, সুস্থ আছেন। আজ আমি আপনাদের সাথে এমন একটি বিষয় নিয়ে কথা বলবো, যা হয়তো অনেকের কাছে খুব সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু এর গুরুত্ব আসলে অনেক গভীর, বিশেষ করে যখন আমরা ইনফেকশন কমানোর কথা ভাবি। আমি আমার দীর্ঘদিনের নার্সিং জীবনে দেখেছি, সামান্য একটু সচেতনতার অভাবে, ছোটখাটো কিছু ভুলের কারণে কিভাবে একজন রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যেতে পারে, শুধুমাত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব থেকে ছড়ানো ইনফেকশনের কারণে। সত্যি বলতে কি, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে স্বাস্থ্য সচেতনতা এখনো পুরোপুরি সবার মধ্যে পৌঁছায়নি, সেখানে এই বিষয়গুলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা হাসপাতাল বা ক্লিনিকের পরিবেশে কাজ করেন, তাদের জন্য তো বটেই, এমনকি যারা বাসায় অসুস্থ সদস্যের যত্ন নিচ্ছেন, তাদের জন্যও আজকের এই আলোচনাটা ভীষণ দরকারি হবে বলে আমি মনে করি।

How Bed Making Helps to Reduce Infection in Nursing

আমি নিজে যখন নতুন নার্সিং শুরু করেছিলাম, তখন আমার সিনিয়র আপারা সবসময় বলতেন, "সুমনা, রোগীর আরাম যেমন জরুরি, তেমনি তার বিছানাটা যাতে সবসময় পরিষ্কার থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখাটাও তোমার প্রথম দায়িত্ব।" প্রথমে হয়তো এর গভীরতা আমি অতটা বুঝিনি, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, অসংখ্য রোগীর পাশে থেকে আমি দেখেছি, একটি পরিষ্কার, গোছানো এবং জীবাণুমুক্ত বিছানা কিভাবে একজন রোগীর মানসিক এবং শারীরিক সুস্থতার জন্য সহায়ক হতে পারে। একটি কথা বলে রাখি, এই যে আমরা ইনফেকশন কমানোর কথা বলি, এর একটা বড় অংশ শুরু হয় আমাদের চারপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে, আর বিছানা তো সেই পরিবেশের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই না?

তাহলে চলুন, কথা না বাড়িয়ে শুরু করা যাক আজকের মূল আলোচনায়। কিভাবে বেড মেকিং (bed making) বা বিছানা গোছানোর মাধ্যমে আমরা ইনফেকশনের ঝুঁকি কমাতে পারি, সেই বিষয়েই ধাপে ধাপে কথা বলবো আজ। আমি চেষ্টা করবো আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা আর সহজ কিছু টিপস আপনাদের সাথে শেয়ার করতে, যা আপনার daily practice বা দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগবে। অবশ্যই মনোযোগ দিয়ে পড়বেন, কারণ প্রতিটি ছোট ছোট টিপস কিন্তু অনেক বড় পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।

কেন বেড মেকিং ইনফেকশন কমানোর জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ?

আসলে, বেড মেকিং (bed making) শুধু বিছানা গুছিয়ে রাখাই নয়, এটি স্বাস্থ্যবিধি (hygiene) বজায় রাখার একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ। আপনি হয়তো ভাবছেন, একটা বিছানা গোছালে ইনফেকশন কিভাবে কমে? দেখুন, আমাদের শরীর প্রতিনিয়ত অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবানু, যেমন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাঙ্গাস ইত্যাদির সংস্পর্শে আসে। এই জীবাণুগুলো কাপড়, বিছানা, তোয়ালে, এমনকি বাতাসের মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে হাসপাতালে, যেখানে নানা ধরনের অসুস্থ রোগী থাকেন, সেখানে জীবাণুর প্রকোপ অনেক বেশি। একজন রোগীর ব্যবহৃত বিছানা যদি সঠিকভাবে পরিষ্কার বা জীবাণুমুক্ত না করা হয়, তাহলে সেই জীবাণু খুব সহজেই অন্য রোগীর শরীরে বা একই রোগীর অন্য কোনো খোলা ক্ষতে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা নতুন ইনফেকশন (infection) সৃষ্টি করে বা বিদ্যমান ইনফেকশনকে আরও বাড়িয়ে তোলে। আমার নিজের চোখে দেখা এমন অনেক ঘটনা আছে, যেখানে পরিষ্কার বিছানার অভাবে রোগীর অবস্থার অবনতি হয়েছে।

পরিষ্কার বিছানা: রোগীর আরাম ও দ্রুত সুস্থতার চাবিকাঠি

আপনি কি জানেন, একটা পরিষ্কার, টানটান বিছানা একজন অসুস্থ মানুষের জন্য কতটা আরামদায়ক হতে পারে? কল্পনা করুন, আপনি অসুস্থ এবং আপনার বিছানাটা কুঁচকে আছে, তাতে ধুলোবালি বা ছোট ছোট খাবারের টুকরো লেগে আছে। আপনার কি ভালো লাগবে? অবশ্যই না! ঠিক তেমনি, একজন রোগীর জন্যও পরিষ্কার বিছানা মানসিক স্বস্তি এনে দেয়, যা তার দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য খুবই জরুরি। ইনফেকশন (infection control) কমানোর পাশাপাশি, এটি রোগীর ত্বকের সমস্যা যেমন – বেডসোর (bed sore) বা চাপজনিত ঘা প্রতিরোধেও সাহায্য করে। নোংরা বা ভেজা চাদর ত্বকে ঘষা লেগে আলসার তৈরি করতে পারে, যা ইনফেকশনের জন্য একটি উন্মুক্ত রাস্তা। তাই, শুধুমাত্র ইনফেকশন কমানোর জন্য নয়, রোগীর সামগ্রিক সুস্থতার জন্যও সঠিক বেড মেকিং (bed making procedure) অপরিহার্য। এটি শুধু একটি কাজ নয়, এটি রোগীর প্রতি আপনার যত্ন ও শ্রদ্ধার একটি বহিঃপ্রকাশও বটে।

বেড মেকিং এর আগে প্রস্তুতি: আসল কাজ শুরু হওয়ার আগে

দেখুন, যেকোনো বড় কাজের আগে কিছু প্রস্তুতি নেওয়া খুব জরুরি, তাই না? বেড মেকিংও এর ব্যতিক্রম নয়। সঠিক প্রস্তুতি আপনার কাজকে সহজ করবে এবং ইনফেকশন ছড়ানোর ঝুঁকি (infection prevention) অনেক কমিয়ে দেবে। চলুন, ধাপে ধাপে জেনে নিই কি কি প্রস্তুতি আমাদের নিতে হবে। আমি অবশ্যই প্রতিটি ধাপের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করবো।

১. হাত ধোয়া (Hand washing) – Hand hygiene এর গুরুত্ব

এটি আমার তালিকার এক নম্বরে আছে এবং অবশ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আপনি যখনই কোনো রোগীর কাছাকাছি যাবেন বা তার জিনিসপত্র ধরবেন, আপনার হাত ভালোভাবে পরিষ্কার করা অত্যাবশ্যক। সাবান ও পানি দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোয়া (proper hand washing) উচিত। যদি সাবান ও পানির ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার (hand sanitizer) ব্যবহার করতে পারেন, তবে সাবান-পানির বিকল্প নেই। মনে রাখবেন, আপনার হাত অসংখ্য জীবাণুর আশ্রয়স্থল হতে পারে। আপনি যদি নোংরা হাতে রোগীর বিছানা ধরেন, তাহলে আপনার হাত থেকে জীবাণু বিছানায় ছড়িয়ে পড়তে পারে, যা নতুন করে ইনফেকশন (healthcare associated infection) তৈরি করতে পারে। আমি যখন ডিউটিতে থাকি, তখন প্রতিটা বেড মেকিং এর আগে আর পরে অবশ্যই হাত ধুয়ে নিই। এটা একটা অভ্যাসে পরিণত করা উচিত। আপনার কি মনে হয় না, পরিষ্কার হাতই ইনফেকশন প্রতিরোধের প্রথম ধাপ?

২. প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ (Gathering supplies)

কাজ শুরু করার আগে সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হাতের কাছে গুছিয়ে রাখুন। এর মধ্যে যা যা থাকতে পারে:

  • পরিষ্কার চাদর (clean bed sheets): ফিটেড শীট (fitted sheet), ফ্ল্যাট শীট (flat sheet), কভারলেট (coverlet) বা কম্বল (blanket)। অবশ্যই পরিষ্কার এবং ইস্ত্রি করা চাদর ব্যবহার করুন।
  • বালিশের কভার (pillowcases): রোগীর মাথার নিচে বালিশের জন্য পরিষ্কার কভার।
  • গ্লাভস (gloves): যদি রোগীর শরীরে কোনো ক্ষত থাকে বা রক্ত, পুঁজ, বা অন্য কোনো দেহ তরলের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে অবশ্যই গ্লাভস ব্যবহার করবেন। আমি দেখেছি, অনেকে এই গ্লাভসের ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেন না, কিন্তু এটি আপনাকে এবং রোগীকে উভয়কেই সুরক্ষিত রাখে।
  • ময়লা কাপড় রাখার জন্য একটি লন্ড্রি ব্যাগ (laundry bag) বা পাত্র।
  • যদি প্রয়োজন হয়, ম্যাট্রেস পরিষ্কার করার জন্য জীবাণুনাশক স্প্রে (disinfectant spray) এবং পরিষ্কার কাপড়।

সবকিছু হাতের কাছে থাকলে আপনার কাজ দ্রুত এবং মসৃণ হবে। আপনাকে বারবার জিনিস খুঁজতে যেতে হবে না, এতে সময় বাঁচবে এবং ইনফেকশন ছড়ানোর সুযোগও কমবে।

৩. পরিবেশ তৈরি করা (Preparing the environment)

বিছানা গোছানোর আগে রুমের পরিবেশটাকেও একটু গুছিয়ে নিতে হবে। যদি সম্ভব হয়, তাহলে রুমের জানালা খুলে দিন, যাতে রুমে তাজা বাতাস প্রবেশ করতে পারে। বদ্ধ ঘরে জীবাণু বেশি জমে। অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, যেমন – রোগীর টেবিলের ওপরের বাড়তি ঔষধ, পানির গ্লাস, বইপত্র ইত্যাদি সরিয়ে রাখুন। এতে আপনার কাজ করার জায়গাটা পরিষ্কার থাকবে। মনে রাখবেন, পরিষ্কার বাতাসও জীবাণু কমাতে সাহায্য করে।

৪. রোগীর সাথে কথা বলা (Communicating with the patient)

যদি রোগী বিছানায় থাকে (occupied bed), তাহলে কাজ শুরু করার আগে তার সাথে কথা বলুন। তাকে জানান যে আপনি কি করতে যাচ্ছেন এবং তার সহযোগিতা চান। যেমন – "আপনার বিছানাটা একটু গুছিয়ে দেবো? আপনি কি একটু সহযোগিতা করবেন?" রোগীর সহযোগিতা আপনার কাজকে সহজ করে দেবে এবং সেও স্বস্তি পাবে। এটি রোগীর প্রতি আপনার সম্মানেরও প্রতীক। অনেক সময় রোগীরা দুর্বলতার কারণে কিছু বলতে পারেন না, কিন্তু তারা ঠিকই সবকিছু বোঝেন। তাদের আরামের দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন।

স্টেপ বাই স্টেপ বেড মেকিং: ইনফেকশন কমানোর কার্যকর পদ্ধতি (Effective Method for Infection Control)

প্রস্তুতি পর্ব তো শেষ হলো। এবার চলুন, ধাপে ধাপে জেনে নিই কিভাবে সঠিক পদ্ধতিতে বেড মেকিং (bed making steps) করতে হয়, যাতে ইনফেকশন ছড়ানোর ঝুঁকি (infection transmission risk) সর্বনিম্ন রাখা যায়। আমি চেষ্টা করবো যতটা সম্ভব সহজ করে ব্যাখ্যা করতে।

১. পুরানো চাদর সরানো: সতর্কতার সাথে (Removing Old Linen: With Caution)

এটি একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যেখানে বেশিরভাগ মানুষ ভুল করেন। পুরানো, নোংরা চাদর সরানোর সময় অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

  • ঝাড়াঝাড়ি করবেন না: ময়লা চাদরগুলো কখনোই ঝাড়াঝাড়ি করবেন না। যখন আপনি চাদর ঝাড়েন, তখন তার গায়ে লেগে থাকা ধুলোবালি, ত্বকের মরা কোষ এবং জীবাণু বাতাসের সাথে মিশে যায়। এগুলো বাতাসের মাধ্যমে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং অন্যদের শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে ইনফেকশন (airborne infection) ঘটাতে পারে। আপনি কি জানেন, ছোট একটি ধুলোর কণার সাথেও অসংখ্য জীবাণু থাকতে পারে?
  • নিজেকে রক্ষা করুন: ময়লা চাদরগুলোকে আপনার পোশাক বা ইউনিফর্মের থেকে দূরে রাখুন। ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিন, যাতে জীবাণু আপনার পোশাকের সংস্পর্শে না আসে। ময়লা চাদরকে এমনভাবে ভাঁজ করুন যাতে তার ভেতরের ময়লা অংশটি বাইরে না থাকে।
  • নির্দিষ্ট স্থানে রাখুন: সরানো চাদরগুলো কখনোই মেঝেতে বা পরিষ্কার আসবাবপত্রে রাখবেন না। এগুলো সরাসরি একটি লন্ড্রি ব্যাগ বা নির্দিষ্ট ময়লা কাপড়ের পাত্রে রাখুন। হাসপাতাল বা ক্লিনিকে এর জন্য আলাদা ডাস্টবিন বা ট্রলি থাকে। বাসায়ও একটি নির্দিষ্ট বালতি বা ব্যাগ ব্যবহার করুন।
  • পুনরায় হাত ধোয়া: পুরানো চাদর সরানোর কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আবার হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিন। আপনার হাতে জীবাণু লেগে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আমি অবশ্যই এর ওপর জোর দিতে চাই।

২. ম্যাট্রেস পরিষ্কার করা: লুকানো জীবাণুর বাসা (Cleaning the Mattress: Home of Hidden Germs)

পুরানো চাদর সরানোর পর ম্যাট্রেসের অবস্থা পরীক্ষা করুন। যদি ম্যাট্রেসে কোনো ময়লা, দাগ বা তরল পদার্থ লেগে থাকে, তাহলে সেটি অবশ্যই পরিষ্কার করতে হবে। ম্যাট্রেস অনেক সময় জীবাণুর আঁতুড়ঘর হতে পারে, বিশেষ করে যদি রোগী মূত্রত্যাগ বা অন্য কোনো তরল পদার্থ বিছানায় ফেলে থাকে।

  • পরিষ্কার করার পদ্ধতি: একটি পরিষ্কার ভেজা কাপড় নিন। প্রয়োজন হলে হালকা সাবান পানি বা জীবাণুনাশক স্প্রে ব্যবহার করতে পারেন। ম্যাট্রেসটি ভালোভাবে মুছে নিন। সব ময়লা পরিষ্কার হয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত করুন।
  • শুকানোর গুরুত্ব: ম্যাট্রেস মোছার পর এটিকে পুরোপুরি শুকিয়ে নিতে হবে। ভেজা ম্যাট্রেসে ছত্রাক (fungus) এবং ব্যাকটেরিয়া (bacteria) জন্মানোর সম্ভাবনা বেশি থাকে। যদি সম্ভব হয়, জানালা খুলে বাতাস চলাচল নিশ্চিত করুন বা ফ্যান ব্যবহার করুন। শুকানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় দিন।
  • ম্যাট্রেস প্রোটেক্টর: যদি রোগীর বিছানায় প্রস্রাব বা অন্য কিছু পড়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে ম্যাট্রেসের উপর একটি ওয়াটারপ্রুফ ম্যাট্রেস প্রোটেক্টর (waterproof mattress protector) ব্যবহার করতে পারেন। এটি ম্যাট্রেসকে পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করবে এবং ইনফেকশনের ঝুঁকি কমাবে।

৩. নতুন চাদর পাতা: সঠিক কৌশল (Laying New Linen: The Correct Technique)

এবার আসে নতুন, পরিষ্কার চাদর পাতার পালা। এটিও খুব সতর্কতার সাথে করতে হবে।

  • ফিটেড শীট (Fitted sheet) বা নিচের চাদর: প্রথমে ম্যাট্রেসের ওপর ফিটেড শীটটি পাতুন। এর চার কোণা ম্যাট্রেসের নিচে ভালোভাবে ঢুকিয়ে দিন, যাতে এটি কুঁচকে না যায়। বিছানার চাদর টানটান থাকলে রোগীর অস্বস্তি কম হয় এবং জীবাণু লুকানোর জায়গাও কম থাকে।
  • ফ্ল্যাট শীট (Flat sheet) বা উপরের চাদর: যদি ফ্ল্যাট শীট ব্যবহার করেন, তবে এটিকে ফিটেড শীটের উপরে এমনভাবে পাতুন যাতে চাদরের উল্টো দিকটি উপরের দিকে থাকে। পায়ের দিকে চাদরের বাড়তি অংশ ম্যাট্রেসের নিচে ঢুকিয়ে দিন। এরপর আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল, যাকে আমরা "মিত্রড কর্নার" (mitered corner) বলি। এটি দেখতে সুন্দর লাগে এবং চাদরকে টানটান রাখে। এটি দেখতে অনেকটা খামের কোণার মতো হয়। এর জন্য, চাদরের সাইড থেকে অল্প অংশ তুলে নিন, তারপর সাইড এবং পায়ের দিকের অংশ ম্যাট্রেসের নিচে ঢুকিয়ে দিন। এটি বেড মেকিং এর একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ, বিশেষ করে হাসপাতালে।
  • কম্বল বা কভারলেট (Blanket/Coverlet): কম্বল বা কভারলেট চাদরের উপরে এমনভাবে পাতুন যাতে রোগীর মুখ ঢাকা না পড়ে। এটিও একইভাবে মিত্রড কর্নার করে বা ম্যাট্রেসের নিচে গুঁজে দিন। রোগীর আরামের জন্য কম্বলকে খুব টাইট করবেন না।
  • বালিশের কভার (Pillowcase) লাগানো: পরিষ্কার বালিশের কভার দিয়ে বালিশ ঢুকিয়ে দিন। বালিশের কভার ভালোভাবে লাগানো হয়েছে কিনা, তা নিশ্চিত করুন। বালিশও যেন পরিষ্কার ও শুকনো থাকে।
  • পুনরায় ঝাড়াঝাড়ি নয়: নতুন চাদর পাতার সময়ও চাদরগুলো ঝাড়াঝাড়ি করবেন না। আলতো করে পাতুন।

৪. অকুপাইড বেড (Occupied Bed) মেকিং: যখন রোগী বিছানায় থাকে

যদি রোগী বিছানায় থাকে এবং তাকে বিছানা থেকে নামানো সম্ভব না হয়, তাহলে "অকুপাইড বেড মেকিং" করতে হয়। এটি একটু কঠিন হলেও, সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে সহজেই করা যায় এবং রোগীর আরাম বজায় থাকে।

  • রোগীর সহযোগিতা: প্রথমে রোগীকে একপাশে ঘুরিয়ে শুতে বলুন। প্রয়োজনে তার মাথা ও কাঁধের নিচে বালিশ দিয়ে সহায়তা করুন।
  • এক পাশ থেকে কাজ: বিছানার এক পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করুন। প্রথমে সেই পাশের পুরানো চাদর সরিয়ে নিন এবং ময়লা চাদরগুলো রোগীকে না ছুঁইয়ে তার শরীরের নিচ থেকে আলতো করে গুঁজে দিন।
  • পরিষ্কার চাদর পাতা: এরপর পরিষ্কার চাদরের একটি অর্ধেক অংশ সেই পাশেই ম্যাট্রেসের উপর পাতুন এবং বাকি অর্ধেক অংশ রোগীর শরীরের নিচে সাবধানে গুঁজে দিন।
  • রোগীকে ঘোরানো: এবার রোগীকে অন্য পাশে ঘুরিয়ে শুতে বলুন। এই সময় রোগীর শরীরের নিচে যে পুরানো চাদর ছিল, সেটি টেনে বের করে নিন এবং ময়লা কাপড়ের ব্যাগে ফেলে দিন। তারপর পরিষ্কার চাদরের বাকি অংশটি টেনে নিয়ে ম্যাট্রেসের নিচে ভালোভাবে ঢুকিয়ে দিন।
  • ধীরে ধীরে কাজ: সম্পূর্ণ কাজটি খুব ধীরে ধীরে এবং সাবধানে করুন, যাতে রোগী কোনো আঘাত না পায় বা অস্বস্তিতে না পড়ে।
  • রোগীর আরাম: কাজ শেষে নিশ্চিত করুন যে রোগী আরামদায়ক অবস্থায় আছে এবং চাদরগুলো কোথাও কুঁচকে নেই।
  • হাত ধোয়া: অকুপাইড বেড মেকিং শেষ হওয়ার সাথে সাথেই অবশ্যই আপনার হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিন।

সাধারণ ভুলগুলো এড়িয়ে চলুন (Avoid Common Mistakes)

আমি দেখেছি, অনেকেই বেড মেকিং এর সময় কিছু সাধারণ ভুল করে ফেলেন, যা ইনফেকশন ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। চলুন, সেগুলো নিয়ে একটু কথা বলি, যাতে আপনি এই ভুলগুলো এড়িয়ে চলতে পারেন:

  • ময়লা চাদর মেঝেতে ফেলা: এটি একটি খুবই খারাপ অভ্যাস। ময়লা চাদরে অসংখ্য জীবাণু থাকে, যা মেঝেতে পড়লে আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। কখনোই এটি করবেন না।
  • হাত না ধুয়ে কাজ করা: আগেই বলেছি, হাত ধোয়া সবচেয়ে জরুরি। ময়লা চাদর ধরবেন, আবার পরিষ্কার চাদর ধরবেন, তারপর রোগীর শরীর ধরবেন—এতে করে জীবাণু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাবেই। অবশ্যই বেড মেকিং এর আগে ও পরে হাত ধোয়া (hand hygiene importance) জরুরি।
  • ময়লা চাদর ঝাড়া: এটিও একটি বড় ভুল। ঝাড়ার ফলে জীবাণু বাতাসে মিশে যায়।
  • ছেঁড়া বা নোংরা চাদর ব্যবহার: পুরনো, ছেঁড়া বা দাগযুক্ত চাদর ব্যবহার করবেন না। পরিষ্কার ও অক্ষত চাদর ব্যবহার করা উচিত। ছেঁড়া চাদরে জীবাণু বাসা বাঁধতে পারে।
  • রোগীর ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের সাথে চাদরের মিশ্রণ: রোগীর টুথব্রাশ, চিরুনি বা অন্য ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের সাথে চাদর মিশিয়ে ফেলবেন না। প্রতিটি জিনিসের জন্য আলাদা স্থান রাখুন।
  • দ্রুততার সাথে কাজ করা: তাড়াহুড়ো করে কাজ করতে গিয়ে অনেকে ভুল করে ফেলেন। সবসময় ধীর স্থিরভাবে এবং মনোযোগ দিয়ে কাজ করুন।

আপনি কি এই ভুলগুলোর কোনটি কখনো করেছেন? চিন্তা নেই, এখন থেকে সতর্ক থাকুন।

আশাকরি আমার এই বিষয় নিয়ে আলোচনা আপনাদের ভালো লেগেছে। অপেক্ষা করুন পরবর্তী বিষয় নিয়ে হাজির হবো খুব শীঘ্রই।

No Comments
Add Comment
comment url
মোছাঃ সুমনা খাতুন
Author পরিচিতি:
👤 মোছাঃ সুমনা খাতুন
BNMC রেজিস্টার্ড নার্স
🏢 পদবী: Senior Staff Nurse
🏥 চাকরি: Nasir Uddin Memorial Hospital

Related Posts

Loading...