করোনা রোগীদের সেবায় নার্সদের অভিজ্ঞতা
করোনা রোগীদের সেবায় নার্সদের অভিজ্ঞতা: একজন বাংলাদেশী নার্সের চোখে দেখা
আসসালামু আলাইকুম! কেমন আছেন সবাই? আশা করি সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে আপনারা সবাই ভালো আছেন। আপনাদের প্রিয় ব্লগ সিসটার্স কেয়ারে আপনাদের সবাইকে আবারও অনেক অনেক উষ্ণ স্বাগত জানাচ্ছি।
আজকে আমি আপনাদের সাথে এমন একটি বিষয় নিয়ে কথা বলতে এসেছি যা আমাদের সকলের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছিল – করোনা ভাইরাস (Corona Virus) বা COVID-19 মহামারী। সত্যি বলতে, এই নামটি শুনলেই আজও আমাদের মনে এক অন্যরকম ভয় আর শঙ্কা কাজ করে। কিন্তু এই ভয় বা শঙ্কাকে জয় করে যারা সম্মুখ সারিতে দাঁড়িয়ে কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম আমরা, নার্সরা। আমি নিজে মোছাঃ সুমনা খাতুন, আপনাদেরই একজন বাংলাদেশী নার্স, আর আজকের এই লেখায় আমি আমার এবং আমার সহকর্মীদের সেই অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে ভাগ করে নিতে চাই।
আমি নিজে দেখেছি, কোভিড ওয়ার্ডে কাজ করাটা কেমন চ্যালেঞ্জিং ছিল। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এটা শুধু একটা পেশা ছিল না, এটা ছিল একটা যুদ্ধ। প্রতিদিন যুদ্ধ। অদৃশ্য এক শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। একটি কথা বলে রাখি, এই অভিজ্ঞতাগুলো শুধু আমার একার নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি হাসপাতালে, প্রতিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মী (Healthcare Worker) এবং নার্সদেরই গল্প। তাহলে চলুন কথা না বাড়িয়ে শুরু করা যাক সেই কঠিন সময়ের কিছু বাস্তব কথা।
শুরুর দিনগুলো: অজানা ভয় আর অনিশ্চয়তা
দেখুন, যখন করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে প্রথম প্রবেশ করল, তখন আমাদের সবার মনে একটা বড় প্রশ্ন ছিল – এটা আসলে কী? কীভাবে এর চিকিৎসা হবে? কীভাবেই বা এর মোকাবিলা করব আমরা? সত্যি বলতে, শুরুর দিকে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না। বিশ্বজুড়েই একটা ভয়ের বাতাবরণ ছিল। আমি নিজে দেখেছি, আমার সহকর্মীদের অনেকের চোখেও সেই ভয়টা ছিল। নিজেদের পরিবারের কথা ভেবে মন খারাপ হতো। ছোট্ট একটা সন্তান বা বয়স্ক বাবা-মাকে রেখে কর্মস্থলে আসাটা প্রতিদিন একটা কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল।
সেই সময় পিপিই (PPE) বা পার্সোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট নিয়ে একটা বড় সংকট ছিল। আমরা অনেকেই জানতাম না কোনটা সঠিক পিপিই, কীভাবে পরতে হয় বা খুলতে হয়। হাসপাতালে সীমিত সংখ্যক পিপিই ছিল, যা দিয়ে সবাইকে কভার করা কঠিন ছিল। কিন্তু কর্তব্যবোধ আর রোগীদের প্রতি ভালোবাসা আমাদের আটকে রাখতে পারেনি। আমরা প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করলাম, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সঠিক পদ্ধতিগুলো শিখলাম। একে অপরকে সাহস দিলাম। অবশ্যই, এই বিষয়টা নার্সিং পেশার এক নতুন দিক উন্মোচন করেছিল।
একটি কথা বলে রাখি, করোনা ওয়ার্ডে কাজ শুরু করার আগে আমার নিজের মনেও একটা বিশাল প্রশ্নচিহ্ন ছিল – আমি কি পারব? নিজের পরিবারকে সংক্রমিত করে ফেললে কি হবে? কিন্তু যখন একজন মুমূর্ষু রোগীকে চোখের সামনে দেখেছি, তখন সব ভয় দূর হয়ে শুধু একটা চিন্তা মাথায় এসেছে – আমাকে বাঁচাতে হবে। যেকোনো মূল্যে।
নতুন স্বাভাবিকের সাথে মানিয়ে নেওয়া: প্রতিকূলতার পথে
করোনা আসার পর আমাদের নার্সিং পেশায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমি নিজে দেখেছি, আমাদের কাজ করার পদ্ধতিটাই পাল্টে গেছে। নতুন প্রটোকল (Protocol) তৈরি হলো, যা কঠোরভাবে মেনে চলা আবশ্যক ছিল। মাস্ক, গ্লাভস, ফেস শিল্ড, গাউন – এগুলোই যেন আমাদের দ্বিতীয় ত্বক হয়ে উঠলো। একটি কথা বলে রাখি, এই পোশাকগুলো পরে একটানা আট-দশ ঘণ্টা কাজ করাটা শারীরিকভাবে কতটা কষ্টকর ছিল, তা ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। বিশেষ করে গরমের দিনে, ভেতরে ঘামে ভিজে একাকার হয়ে যেতাম। তবুও আমরা অবিচল ছিলাম।
আমাদের কাজের প্রধান অংশ ছিল সংক্রমণ প্রতিরোধ (Infection prevention)। প্রতিটি রোগীর সংস্পর্শে আসার আগে এবং পরে কঠোরভাবে হাত ধোয়া, স্যানিটাইজার ব্যবহার করা, সবকিছু জীবাণুমুক্ত রাখা – এগুলো আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। আমি নিজে দেখেছি, সামান্য অসাবধানতার কারণেও কীভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে যেতে পারে। তাই আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতাম।
আইসিইউ সেবা (ICU care) এবং অক্সিজেন থেরাপি (Oxygen therapy) কোভিড রোগীদের সেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। অনেক রোগীকে ভেন্টিলেটরে রাখতে হয়েছে। এই সময়গুলোতে প্রতিটি নার্সের কাঁধে অনেক বড় দায়িত্ব ছিল। মেশিনের দিকে সতর্ক নজর রাখা, রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি পর্যবেক্ষণ করা, ওষুধপত্র সঠিকভাবে দেওয়া – প্রতিটা কাজই ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি কথা বলে রাখি, এই কঠিন সময়গুলোতে আমরা নিজেরা নিজেদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলাম। একে অপরের পাশে দাঁড়ানো, সাহস যোগানো, এটাই ছিল আমাদের মূলমন্ত্র।
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, মাস্কের আড়ালে আপনার হাসিমুখটা যখন দেখা যায় না, তখন কীভাবে একজন রোগীকে ভরসা দেবেন? সত্যি বলতে, এটাই ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা চোখে চোখ রেখে কথা বলতাম, হাত দিয়ে ইশারা করতাম, মৃদুস্বরে কথা বলতাম যাতে রোগীরা আমাদের কথা শুনতে পায় এবং বুঝতে পারে যে আমরা তাদের পাশেই আছি। অবশ্যই, এই মানবিকভাবে সংযোগ স্থাপনের চেষ্টাটা রোগীর মানসিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।
প্রতিদিনের যুদ্ধ: রোগীর যত্ন ও মানসিক চাপ
আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, করোনা রোগীদের যত্ন নেওয়াটা শুধুমাত্র শারীরিক ছিল না, এটা ছিল মানসিকও। আমি নিজে দেখেছি, অনেক রোগী যখন দেখতেন যে তারা তাদের পরিবারের থেকে দূরে আছেন, তখন তারা মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়তেন। তাদের মধ্যে হতাশা, ভয় আর একাকীত্ব কাজ করত। আমাদের কাজ শুধু ওষুধ দেওয়া বা ইনজেকশন দেওয়া ছিল না, তাদের সাথে কথা বলা, তাদের ভরসা দেওয়া, হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করাটাও ছিল আমাদের দায়িত্বের অংশ।
বাংলাদেশে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ছিল অসহনীয়। একটি বেডে দু-তিনজন রোগী রাখার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল। আমি নিজে দেখেছি, কীভাবে একজন নার্স একসঙ্গে অনেক রোগীর দেখাশোনা করেছেন, নিজের ক্লান্তি ভুলে গিয়ে। সারাদিন পিপিই পরে কাজ করার পর শরীর আর চলত না। তবুও পরের দিন আবার সেই একই উদ্যমে কাজ শুরু করতাম।
আমাদের কাজগুলোতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল:
- রোগীর তাপমাত্রা, পালস, রক্তচাপ এবং অক্সিজেন স্যাচুরেশন নিয়মিত পরীক্ষা করা।
- ডাক্তারদের দেওয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী সঠিক সময়ে ওষুধপত্র দেওয়া।
- রোগীদের পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ নিশ্চিত করা।
- রোগীদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে সাহায্য করা।
- রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা হলে দ্রুত অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করা।
- রোগীদের মানসিক স্বাস্থ্য (Mental health) বিষয়ক সহায়তা দেওয়া, তাদের সাথে কথা বলে সাহস যোগানো।
অবশ্যই, এই প্রতিটি কাজের জন্য ধৈর্য ও সাহস (Patience and courage) এর প্রয়োজন ছিল। আমরা নিজেদের পরিবার থেকে দূরে থাকতাম, কারণ আমরা চাইনি আমাদের মাধ্যমে তাদের সংক্রমণ হোক। অনেক নার্সকে দেখেছি, মাসের পর মাস হাসপাতালে বা হোস্টেলে থেকেছেন, শুধু রোগীদের সেবা করার জন্য। এটা ছিল এক বড় ত্যাগ (Sacrifice)।
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, একজন সেবাদানকারী (Caregiver) হিসেবে নিজের মানসিক চাপ সামলানো কতটা কঠিন? সত্যি বলতে, আমাদের মধ্যেও ভয় ছিল, উদ্বেগ ছিল। কোনো রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে গেলে বা হঠাৎ মারা গেলে আমাদের সবার মন ভেঙে যেত। কিন্তু আমরা একে অপরের উপর ভরসা রেখে সামনে এগিয়েছি। আমাদের সুপারভাইজাররা আমাদের মানসিক সমর্থন দিতেন, যা সত্যিই অনেক সাহায্য করেছে।
অনুপ্রেরণার গল্প: যখন আশার আলো জ্বলে ওঠে
এত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও কিছু ঘটনা আমাদের মনে আশার আলো জ্বেলে দিত। আমি নিজে দেখেছি, যখন একজন গুরুতর অসুস্থ রোগী ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতেন, যখন তাদের মুখে হাসি ফুটতো, তখন আমাদের সব ক্লান্তি দূর হয়ে যেত। তাদের সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়াটাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
একটি ঘটনা আমার আজও মনে আছে। একজন বয়স্ক দম্পতি একসঙ্গে করোনা আক্রান্ত হয়ে আমাদের ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছিলেন। তাদের অবস্থা খুবই গুরুতর ছিল। বিশেষ করে বৃদ্ধা মহিলার শ্বাসকষ্ট এতটাই বেশি ছিল যে আমরা খুব চিন্তায় ছিলাম। কিন্তু আমাদের নিরলস চেষ্টা, সঠিক নার্সিং কেয়ার (Nursing care) এবং তাদের নিজেদের বাঁচার অদম্য ইচ্ছাশক্তির কারণে তারা দুজনেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন। সেদিন তাদের পরিবারের সদস্যদের মুখে যে আনন্দ দেখেছিলাম, তা ভোলার নয়। এই ধরনের ঘটনাগুলোই আমাদের আরও বেশি উৎসাহিত করত।
আসলে, নার্সিং পেশাটাই এমন। যখন একজন রোগী সুস্থ হয়ে হাসিমুখে বিদায় নেন, তখন মনে হয় আমাদের সব কষ্ট সার্থক। এই অনুপ্রেরণা থেকেই আমরা প্রতিদিন নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করি। আমি দেখেছি, এই মহামারীর সময় আমাদের দেশের মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছিল। বিভিন্ন সংগঠন, ব্যক্তি এগিয়ে এসেছিল স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে। এটা দেখেও খুব ভালো লাগত।
অবশ্যই, আমাদের বাংলাদেশের মানুষ খুবই আবেগপ্রবণ এবং সহানুভূতিশীল। এই কঠিন সময়েও এই মানবিকতা আমাদের শক্তি জুগিয়েছে।
সামাজিক চ্যালেঞ্জ ও ভুল ধারণা
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, করোনা মহামারীর সময় আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেক সময় সমাজের কিছু ভুল ধারণার শিকার হতে হয়েছে। আমি নিজে দেখেছি, অনেক জায়গায় নার্স বা ডাক্তারদের বাসা ভাড়া দিতে চাইত না, অথবা তাদের দিকে সন্দেহের চোখে তাকাতো। এই বিষয়টি আমাদের জন্য খুবই কষ্টকর ছিল। আমরা যারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে মানুষের সেবা করছি, তাদের প্রতি এমন আচরণ সত্যিই হতাশাজনক।
একটি কথা বলে রাখি, এই ভুল ধারণাগুলো দূর করা খুব জরুরি। কারণ আমরা সবাই একই সমাজে বাস করি এবং একে অপরের সাহায্য ছাড়া আমরা কেউই বাঁচতে পারি না। সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থা এই ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করেছে, যা খুবই প্রশংসনীয়। অবশ্যই, মানুষের এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হওয়াটা খুব জরুরি।
আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, আপনার পাশের একজন নার্স যখন নিজের জীবন বিপন্ন করে অন্যের সেবা করছেন, তখন তার প্রতি আপনার কেমন আচরণ করা উচিত? সত্যি বলতে, তাদের প্রতি সম্মান জানানো এবং সহযোগিতা করাই আমাদের কর্তব্য।
শিক্ষণীয় বিষয় এবং ভবিষ্যতের প্রস্তুতি
আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, করোনা মহামারী আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে গেছে। এটি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট ছিল না, এটি আমাদের সামাজিক কাঠামো, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং ব্যক্তিগত resilience (স্থিতিস্থাপকতা) পরীক্ষা করেছে।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয়:
- প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি: যেকোনো মহামারীর জন্য দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা (Health system) কে আরও শক্তিশালী করতে হবে। পর্যাপ্ত সংখ্যক হাসপাতাল বেড (Hospital bed), অক্সিজেন সরবরাহ, পিপিই এবং ওষুধ মজুত রাখা আবশ্যক।
- প্রশিক্ষণ: নার্সিং স্টাফ (Nursing staff) এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ (Training) এর ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে দক্ষতার সাথে কাজ করতে পারে।
- মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা: সম্মুখ সারির স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য (Mental health) সহায়তা এবং কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। আমি নিজে দেখেছি, অনেক নার্স এই কঠিন সময়ে মানসিক চাপের শিকার হয়েছেন।
- জনসচেতনতা: জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক তথ্য প্রচার করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গুজব এবং ভুল তথ্য সমাজে বিভ্রান্তি ছড়ায়, যা পরিস্থিতি আরও খারাপ করে তোলে।
- সহযোগিতা: সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, বেসরকারি সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সহযোগিতা এবং সমন্বয় আরও বাড়াতে হবে।
অবশ্যই, আমরা এখন জানি কীভাবে একটি মহামারীর সাথে লড়াই করতে হয়। আমরা এখন অনেক বেশি প্রস্তুত। ভবিষ্যতে এমন কোনো পরিস্থিতি এলে, আমরা আরও দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করতে পারব বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। বাংলাদেশী নার্স (Bangladeshi nurse) হিসেবে আমরা নিজেদের কাজটা আরও ভালোভাবে করার জন্য সবসময় প্রস্তুত থাকি।
আপনিও পারবেন: কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ
যদি আপনার পরিবারে বা পরিচিতদের মধ্যে কেউ করোনা আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তাহলে একজন নার্স হিসেবে আমার কিছু ব্যবহারিক পরামর্শ আছে যা আপনার কাজে আসতে পারে:
- শান্ত থাকুন: আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকার চেষ্টা করুন। এতে পরিস্থিতি ভালোভাবে মোকাবিলা করতে পারবেন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ নিন: দ্রুত চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী চলুন। অযথা ঘরোয়া টোটকা বা অপ্রমাণিত চিকিৎসার পেছনে ছুটবেন না।
- মাস্ক ব্যবহার করুন: রোগীর কাছে যাওয়ার সময় অবশ্যই মাস্ক পরুন এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন।
- হাত ধোয়া: সাবান ও পানি দিয়ে ঘন ঘন হাত ধোন অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন।
- রোগীর পরিচর্যা: রোগীর খাবার, পানীয়, ওষুধপত্র সময় মতো দিন। তাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন।
- মানসিক সমর্থন: রোগীর সাথে কথা বলুন, তাদের সাহস দিন। তাদের একাকী বোধ করতে দেবেন না।
- পুষ্টিকর খাবার: রোগীকে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার এবং তরল খেতে দিন।
- সতর্কতা: রোগীর ব্যবহৃত থালা-বাসন, কাপড়চোপড় আলাদা রাখুন এবং জীবাণুমুক্ত করুন।
একটি কথা বলে রাখি, সঠিক তথ্য জানা এবং সচেতন থাকাটাই রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রথম ধাপ। অবশ্যই, আপনিও পারবেন আপনার পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে এবং আক্রান্ত সদস্যের সঠিক সেবা দিতে। আমাদের নার্সিং অভিজ্ঞতা (Nursing experience) আমাদের এটাই শিখিয়েছে।
উপসংহার
প্রিয় পাঠকবৃন্দ, করোনা রোগীদের সেবায় নার্সদের ভূমিকা (Role of nurses) শুধু একটি পেশাগত দায়িত্ব ছিল না, এটি ছিল মানবতা ও ত্যাগের এক অনন্য উদাহরণ। আমি মোছাঃ সুমনা খাতুন, আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে যা দেখেছি, তা আপনাদের সাথে ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। এই কঠিন সময়ে আমরা দেখেছি, মানুষ হিসেবে আমরা কতটা শক্তিশালী, কতটা সহনশীল এবং একে অপরের প্রতি কতটা সহানুভূতিশীল হতে পারি।
করোনা মহামারী আমাদের শিখিয়েছে জীবনের মূল্য, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুরুত্ব এবং মানবিক সেবার অপরিহার্যতা। আমরা নার্সরা সবসময় মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলাম, আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকব। এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের আরও বেশি শক্তিশালী করেছে, আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।
আমি আশা করি, আমার এই লেখাটি আপনাদের কাছে ভালো লেগেছে এবং আপনারা করোনা ভাইরাস (Corona Virus) মোকাবিলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ করে নার্সদের সংগ্রাম ও ত্যাগের কিছুটা হলেও আঁচ করতে পেরেছেন। আপনাদের সকলের সুস্বাস্থ্য এবং সুন্দর জীবন কামনা করছি। আপনাদের ভালোবাসা আর দোয়া আমাদের কাজের অনুপ্রেরণা। সবসময় সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন, আর আমাদের মতো বাংলাদেশী নার্সদের জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ হাফেজ!
আপনারা কি মনে করেন, ভবিষ্যতে এমন কোনো সংকট মোকাবিলায় আমাদের আর কী কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত? কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন।